চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) সদর দপ্তরের বেতন ও টিএ (ভ্রমণ ভাতা) বিল শাখার কার্যক্রম ঘিরে অনিয়ম, অর্থ লেনদেন এবং একটি কথিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে অফিস সহকারী সীতানাথ রায়ের বিরুদ্ধে। টিএ বিল পাস করানোর কথা বলে পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে বিলের ১০ শতাংশ অর্থ নেওয়া, পছন্দের ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট শাখায় পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক কাজে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সিএমপি সদর দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শাখায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুবাদে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে সীতানাথ রায়ের। তাঁর বিরুদ্ধে টিএ বিল শাখায় দায়িত্ব পাওয়ার পর কয়েকজন পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে কনস্টেবল ইয়াসিন নামের এক পুলিশ সদস্যকে ঘিরে অভিযোগটি সামনে এসেছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন : প্রাপ্ত অভিযোগে সীতানাথ রায়ের পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর এলাকার বাসিন্দা এবং সিএমপিতে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। তাঁর সিআইভি নম্বর হিসেবে ৮৭১২১৫০১৪৯ উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১২ সালে বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে পুলিশ বিভাগের মিনিস্টেরিয়াল স্টাফ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরে বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে সারা দেশের প্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর এলাকার বাসিন্দা সীতানাথ রায় নিয়োগ পান। এ ক্ষেত্রে সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সেলিমের নামও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেতন শাখায় টাকা নেওয়ার অভিযোগ : অভিযোগে বলা হয়েছে, সীতানাথ রায় সিএমপি সদর দপ্তরের বেতন শাখায় অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গেজেটেড কর্মকর্তা, বিশেষ করে উপপরিদর্শক (এসআই) ও সার্জেন্টদের বেতনসংক্রান্ত কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে ১০০, ২০০ ও ৫০০ টাকা করে নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি বেতন শাখা থেকে টিএ বিল শাখায় দায়িত্ব পান। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বর্তমানে টিএ বিল পাস করানোর কথা বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে বিলের ১০ শতাংশ অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ অর্থ সংগ্রহের কাজে কনস্টেবল ইয়াসিনকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে এসআই রুস্তম আলী ও এসআই শফিকুল ইসলাম পিপিএমসহ আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে টিএ বিল পাস করানোর কথা বলে অর্থ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
কনস্টেবল ইয়াসিনকে ঘিরে নতুন অভিযোগ : টিএ বিল শাখায় কথিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কনস্টেবল ইয়াসিন। অভিযোগকারীদের দাবি, গোপালগঞ্জের বাসিন্দা ইয়াসিনকে আগে বেতন শাখায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে সেখান থেকে টিএ বিল শাখায় বদলি করে আনা হয়। এ বদলির পেছনে সীতানাথ রায়ের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ইয়াসিনকে টিএ বিল শাখায় পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ : সীতানাথ রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গোপালগঞ্জের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে পুলিশ বিভাগের কিছু সদস্যকে সিএমপির নির্দিষ্ট শাখায় বদলি বা পদায়নের চেষ্টা করেন তিনি। এভাবে নিজের পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রভাববলয় গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি সিএমপির প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে বেতন শাখার দায়িত্ব থেকে টিএ বিল শাখার ইনচার্জের দায়িত্ব পেয়েছেন সীতানাথ রায়। এ ক্ষেত্রে ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে তথ্য পাচারের অভিযোগ : সীতানাথ রায়ের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ হলো, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তথ্য আদান-প্রদান করতেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এখনো গোপালগঞ্জের বিভিন্ন ব্যক্তি, পুলিশ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা এবং চট্টগ্রামে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। এসব যোগাযোগ ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন : সিএমপি সদর দপ্তরের বেতন ও টিএ বিল শাখা পুলিশ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ ধরনের শাখায় বিল অনুমোদন বা প্রক্রিয়াকরণের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে বিল পাসের জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে, শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মচারী নয়-বিল প্রক্রিয়াকরণ, যাচাই ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্বও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা দরকার।
তদন্তের দাবি : অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির জন্য সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনের কাছে কয়েকটি বিষয় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। সিএমপির মতো গুরুত্বপূর্ণ পুলিশি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শাখা নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগজনক।