THE B NEWS 24

রাত ১০:৩০ - মঙ্গলবার - ২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১১ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৬ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
রাত ১০:৩০ - মঙ্গলবার - ২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১১ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৬ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
চট্টগ্রাম সর্বশেষ

পটিয়া-কর্ণফুলীতে সাব রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ অর্পিত সম্পত্তি রেজিস্ট্রি, ইচ্ছেমতো অফিসসূচি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ; অস্বীকার অভিযুক্তের

চট্টগ্রামের পটিয়া ও কর্ণফুলী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকারী সাব-রেজিস্ট্রার মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে অর্পিত সম্পত্তি রেজিস্ট্রি, ইচ্ছেমতো অফিসসূচি পরিবর্তন, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই উপজেলার দলিল লেখক ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দাপ্তরিক কার্যক্রমে অনিয়মের কারণে জমি রেজিস্ট্রির কাজে ভোগান্তি বাড়ছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পটিয়া ও কর্ণফুলী-দুই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর্মসূচি অনুসরণ না করে নিজের মতো করে দলিল রেজিস্ট্রির দিন নির্ধারণ করছেন তিনি। পাশাপাশি দক্ষিণ ভূর্ষি মৌজার একটি সরকারি তালিকাভুক্ত সম্পত্তি দানপত্র দলিলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় ভূমি আইন ও সম্পত্তিটির মালিকানা-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্পিত সম্পত্তি রেজিস্ট্রি নিয়ে প্রশ্ন : অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ ভূর্ষি মৌজার একটি মূল্যবান সম্পত্তির মূল মালিক মনীন্দ্র লাল গুহ ভারতে অবস্থান করায় বিএস জরিপে সম্পত্তিটি অনাবাসী ও অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নামে তালিকাভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের গেজেটে সম্পত্তিটি প্রত্যর্পণযোগ্য ‘ক’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পত্তিটির বিষয়ে কেউ আইনি দাবি উপস্থাপন না করায় এর মালিকানা সরকারের অনুকূলে বহাল থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সম্পত্তিটির মালিকানা, হস্তান্তরযোগ্যতা এবং রেজিস্ট্রির আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না করেই সাব-রেজিস্ট্রার মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ ২০২৪ সালের ১৮ জুন দানপত্র দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তিটি রেজিস্ট্রি করেন। দলিলটির নম্বর ৫৪৯৬। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, সম্পত্তিটির সরকারি অবস্থান ও আইনি জটিলতা বিবেচনায় না নিয়ে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়ে থাকলে তা প্রচলিত ভূমি আইন ও নিবন্ধনবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

এ বিষয়ে পটিয়া দলিল লেখক সমিতির পক্ষ থেকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে দলিলটির নিবন্ধন আইনসম্মত ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে সম্পত্তির মূল নথি, গেজেট, মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং নিবন্ধনের সময় উপস্থাপিত দলিলাদি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অফিসসূচি পরিবর্তনে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি : পটিয়া ও কর্ণফুলী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার সূচি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রচলিত সাপ্তাহিক কর্মসূচি অনুযায়ী রবিবার, সোমবার ও মঙ্গলবার পটিয়া অফিসে এবং বুধবার ও বৃহস্পতিবার কর্ণফুলী অফিসে দলিল রেজিস্ট্রির কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা।

কিন্তু অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সাব-রেজিস্ট্রার মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ পটিয়া অফিসে রবিবার ও সোমবার এবং কর্ণফুলী অফিসে বুধবার ও বৃহস্পতিবার দলিল রেজিস্ট্রি করছেন। মঙ্গলবার দাপ্তরিক কাজের কথা বলে রেজিস্ট্রি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর ফলে সপ্তাহের একটি দিন দুই উপজেলার কোনো অফিসেই নিয়মিত দলিল রেজিস্ট্রি হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে জমি কেনাবেচা, দানপত্র, হেবা ও অন্যান্য দলিল নিবন্ধনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।

দলিল সম্পাদনের জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া অনেককে নির্ধারিত দিনে কাজ সম্পন্ন করতে না পেরে ফিরে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তাঁদের যাতায়াত ব্যয় ও সময় নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি জমি হস্তান্তর-সংক্রান্ত জরুরি কাজেও বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সরকারি দপ্তরের নির্ধারিত কর্মসূচি পরিবর্তন করা হলে তার প্রশাসনিক অনুমোদন রয়েছে কি না এবং পরিবর্তিত সূচি সম্পর্কে সেবাগ্রহীতাদের যথাযথভাবে অবহিত করা হচ্ছে কি না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রারের দপ্তরের ব্যাখ্যা ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ : সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাঁদের দাবি, দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফি ও অন্যান্য প্রযোজ্য খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে চাপ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত অর্থ দিতে অনীহা প্রকাশ করলে বিভিন্ন অজুহাতে দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা অনেক সময় তাঁদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় কিংবা প্রয়োজনীয় কাজ আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় অসহায় বোধ করেন। ফলে জমি রেজিস্ট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে তাঁদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জেলা রেজিস্ট্রারকে জানিয়েও প্রতিকার মেলেনি, দাবি সমিতির : পটিয়া দলিল লেখক সমিতির নেতৃবৃন্দের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পরও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

সমিতির সভাপতি সামশুদ্দোহা এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত প্রতিকার দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত উদ্ধৃতি পাওয়া না গেলেও সমিতির পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দলিল লেখকদের দাবি, সরকারি ফি ও নিয়ম অনুসারে সেবা নিশ্চিত করা, নির্ধারিত কর্মসূচি মেনে অফিস পরিচালনা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে অর্পিত সম্পত্তির মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দলিল নিবন্ধনের আগে মালিকানা ও হস্তান্তরযোগ্যতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

অভিযোগ অস্বীকার সাব-রেজিস্ট্রারের : অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ ও বেআইনি দলিল রেজিস্ট্রির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ সত্য নয় এবং তিনি নিয়ম মেনেই দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার জন্য তিনি প্রতিবেদককে পটিয়ায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তবে অর্পিত সম্পত্তির দলিল নিবন্ধনের আইনগত ভিত্তি, মঙ্গলবার রেজিস্ট্রি কার্যক্রম বন্ধ রাখা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর পৃথক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি : পটিয়া ও কর্ণফুলী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, জেলা রেজিস্ট্রার ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের উচিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। বিশেষ করে দক্ষিণ ভূর্ষি মৌজার সম্পত্তির গেজেট, মালিকানা-সংক্রান্ত নথি, দলিল নম্বর ৫৪৯৬-এর নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং অফিসসূচি পরিবর্তনের প্রশাসনিক অনুমোদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সেবাগ্রহীতা ও দলিল লেখকদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রাসঙ্গিক নথি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, জমি রেজিস্ট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *