THE B NEWS 24

বিকাল ৩:৪৩ - মঙ্গলবার - ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৪ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
বিকাল ৩:৪৩ - মঙ্গলবার - ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৪ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
জাতীয় সর্বশেষ

রাষ্ট্রপতি চুপ্পুকে ঘিরে তিন বছরের বিতর্ক: রাজনৈতিক সমর্থন, সাংবিধানিক প্রশ্ন ও পদত্যাগের পথে যাত্রা

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিন বছর তিন মাসের দায়িত্ব পালনকালে একের পর এক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু)। আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত এই রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে—আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সময়ে। দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য, সাংবিধানিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।

সবশেষে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে তাঁর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে।

অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিএনপি সরকার—অবস্থানের পরিবর্তন

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদে বহাল থাকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সে সময় তাঁকে অপসারণের দাবি উঠলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন তুলে বিএনপি তাঁর পদে বহাল থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। ওই অবস্থানের কারণে তাঁকে অপসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা ছিল।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকেন।

নির্বাচনের কয়েক দিনের মধ্যে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংকটের সময় বিএনপি এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর পাশে ছিল। একই সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্যও করেন।

তবে সময়ের সঙ্গে বঙ্গভবন ও সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক পরিচয় ও নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাঁর নাম রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, ছাত্রজীবনে তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। পরে যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তিন বছর কারাবন্দি ছিলেন।

এসব রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।

এ ছাড়া ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ নিয়েও আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

দুদক আইনে কমিশনারদের অবসরের পর প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগের বিধিনিষেধ থাকলেও উচ্চ আদালত ১৯৯৬ সালের একটি রায়ের নজির উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতির পদকে ‘লাভজনক পদ’ নয় বলে অভিহিত করেন। পরে তাঁর নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিট খারিজ হয়ে যায়।

শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গে বিতর্ক

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।

তবে কয়েক মাস পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাঁর কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের কোনো দালিলিক কপি নেই।

এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তাঁর সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিও ওঠে।

পরবর্তীতে বঙ্গভবন থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টিকে মীমাংসিত উল্লেখ করে এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক না করার আহ্বান জানানো হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি ও সরকারের সম্পর্ক নিয়েও একাধিকবার আলোচনা হয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আচরণে তিনি নিজেকে ‘অপমানিত’ মনে করেছেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সাত মাস প্রধান উপদেষ্টা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির প্রেস বিভাগ সরিয়ে নেওয়া এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তাঁর প্রতিকৃতি অপসারণের বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে এবং তাঁর কণ্ঠ সীমিত করার চেষ্টা হয়েছে।

বিতর্কের মধ্যেই দায়িত্বের সমাপ্তি

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রাজনৈতিক পরিচয়, সাংবিধানিক অবস্থান, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে বক্তব্য এবং বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব বিষয় ঘিরে একাধিক বিতর্কের মুখোমুখি হন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।

শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত এই রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের সমাপ্তি হলো বিএনপি সরকারের সময়। তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে তিন বছরের বেশি সময়ের এক আলোচিত অধ্যায়ের ইতি ঘটল।বিবিসি বাংলা

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *