একই জায়গায় বছরের পর বছর। মাঝেমধ্যে বদলি-কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবারও ফিরে আসা সেই পুরোনো দায়িত্বে। থানা থেকে প্রসিকিউশন বিভাগ, সেখান থেকে আবার জিআরও সেরেস্তা। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) এএসআই শাহাদাতকে ঘিরে এমনই এক দীর্ঘস্থায়ী পদায়ন-চক্র নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে ঘুরেফিরে তিনি চট্টগ্রাম আদালতের জিআরও হিসেবে কর্ণফুলী ও হালিশহর থানার দায়িত্বে রয়েছেন। ২০২০ সালে অভিযোগের পর থানায় বদলি হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ এবং পরে সেই একই দুই থানার জিআরও দায়িত্বে ফিরে আসেন। ২০২৫ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মাদক মামলার আলামত, বিশেষ করে ইয়াবা নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে জব্দ করা ভালো মানের ইয়াবা সরিয়ে বিক্রি করা এবং পরে নিম্নমানের ইয়াবা এনে ধ্বংস দেখানোর বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হয়।
২০১৮ থেকে ২০২৬-বদলি হয়, জায়গা বদলায় না
প্রাপ্ত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, এএসআই শাহাদাত ২০১৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম আদালতের জিআরও দায়িত্বে রয়েছেন। কর্ণফুলী ও হালিশহর থানার মামলার নথি ও প্রসিকিউশন-সংক্রান্ত কাজে তার সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের।
২০২০ সালে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ নোমান তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বলে দাবি অভিযোগকারীদের। এরপর শাহাদাত বন্দর জোনে বদলি হয়ে কর্ণফুলী থানায় যান। কিন্তু সেখানে বেশিদিন স্থায়ী হননি। কিছুদিন পর আবার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে বদলি হন এবং পরবর্তী সময়ে ফিরে আসেন কর্ণফুলী ও হালিশহর থানার জিআরও সেরেস্তায়।
একই ধারাবাহিকতার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ২০২৫ সালেও-এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২৫ সালে অভিযোগ ওঠার পর তিনি আবার বন্দর জোনে বদলি হয়ে কর্ণফুলী থানায় যান। সেখানে দুই থেকে তিন মাস থাকার পর ফের আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে আসেন। এরপর কর্ণফুলী ও হালিশহর থানার জিআরও দায়িত্বে থাকা এসআই জুয়েলকে সরিয়ে দিয়ে আবারও এএসআই শাহাদাতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে-একজন এএসআইকে ঘিরে যদি বারবার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন তিনি পুনরায় একই ধরনের স্পর্শকাতর দায়িত্বে ফিরে আসেন?
‘দুই থানার দায়িত্ব, একজন এএসআই’
আরেকটি প্রশ্ন আরও বড়। কর্ণফুলী ও হালিশহর-দুই থানার জিআরও দায়িত্বের সঙ্গে এএসআই শাহাদাতের নাম কেন বারবার সামনে আসছে? অভিযোগকারীদের দাবি, দুই থানার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে এসআই পর্যায়ের কর্মকর্তাও রয়েছেন। কিন্তু এএসআই শাহাদাতকে নিয়েই যেন আলাদা ব্যবস্থা। এসআই জুয়েলের কোনো অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও তাকে সরিয়ে শাহাদাতকে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অধীনে কর্ণফুলী ও হালিশহর পৃথক থানা হিসেবে রয়েছে। আর আদালত পুলিশের কাঠামোয় জিআরও শাখাগুলো আলাদা দায়িত্বে পরিচালিত হয়। চট্টগ্রাম মহানগর বিচার বিভাগের সরকারি তথ্যেও প্রসিকিউশন বিভাগ ও জিআরও শাখার পৃথক কাঠামোর কথা উল্লেখ আছে।
তাহলে প্রশ্ন-একই কর্মকর্তাকে বারবার একই দুই থানার সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রশাসনিক যুক্তি কী?
বদলি নিয়ে ‘লাখ লাখ টাকা’র অভিযোগ
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন এডিসি মফিজুর ইসলামের সময় এএসআই শাহাদাতকে কর্ণফুলী জিআরও হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাদের অভিযোগ, এ পদায়নের পেছনে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রশ্ন থেকেই যায়-তার বদলি ও পদায়নের ধারাবাহিকতা কি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি এর পেছনে বিশেষ কোনো সুপারিশ বা প্রভাব কাজ করেছে?
এর উত্তর খুঁজতে হলে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তার প্রতিটি বদলি ও পদায়ন আদেশ একসঙ্গে পর্যালোচনা করা জরুরি।
মাদক আলামত নিয়ে অভিযোগ সবচেয়ে ভয়ংকর
এএসআই শাহাদাতকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো ইয়াবা নিয়ে কারসাজির অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, মাদক মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জব্দ করা ইয়াবার একটি অংশ বাইরে বিক্রি করা হয়। এরপর কথিত নিম্নমানের ইয়াবা এনে ধ্বংসের জন্য উপস্থাপন করা হয়। বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
একই সঙ্গে কোন কর্মকর্তা জব্দ করেছেন, কে আলামত গ্রহণ করেছেন, কোথায় সংরক্ষণ করেছেন এবং ধ্বংসের সময় কারা উপস্থিত ছিলেন-এসব তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।
আদালতের বাইরে ডিউটি থেকেও ‘ছাড়’?
শুধু জিআরও দায়িত্ব নয়, প্রসিকিউশন বিভাগের নিয়মিত মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতি শুক্রবার ও শনিবার প্রসিকিউশন বিভাগের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য আদালতের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করেন। মাসে একদিন নাইট টহল ডিউটির ব্যবস্থাও থাকে। কিন্তু এএসআই শাহাদাতকে এসব দায়িত্বে খুব কমই দেখা যায়।
এমনকি ডেসপাচের দায়িত্বে থাকা এএসআই মনিরকে অর্থ দিয়ে নিজের জন্য বাইরের ডিউটি এড়িয়ে চলার ব্যবস্থা করার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগের মধ্যেই কেন একই দায়িত্ব?
চট্টগ্রাম আদালতের জিআরও শাখা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ডেস্ক নয়। থানার মামলার নথি, প্রসিকিউশন এবং আদালতের কার্যক্রমের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে একজন কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ঘুরেফিরে একই জায়গায় রাখার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
আর আদালতকেন্দ্রিক দায়িত্বে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও নতুন নয়। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম আদালতের এক জিআরওর বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর তাকে প্রত্যাহার করে তদন্তের কথা জানিয়েছিল সিএমপি।
তাই এএসআই শাহাদাতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও শুধু ‘ব্যক্তিগত অভিযোগ’ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
‘মধু’টা কোথায়?
বছরের পর বছর একই দায়িত্বে থাকার সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে? অভিযোগ ওঠার পরও কেন আবার একই জায়গায় ফিরে আসছেন? অন্য কর্মকর্তাকে সরিয়ে কেন তাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে? মাঠপর্যায়ের ডিউটি থেকে তিনি কীভাবে নিয়মিত ছাড় পাচ্ছেন? আর মাদক মামলার আলামত নিয়ে ওঠা অভিযোগের পেছনে সত্যিই কোনো চক্র আছে কি না?
অভিযোগ অস্বীকার শাহাদাতের
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জিআরও এএসআই শাহাদাত। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেন, মাদক মামলার আলামত নিয়ে অনিয়ম কিংবা ডিউটি এড়াতে অর্থ দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গেও তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
প্রশাসনের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল বলেন, “এএসআই শাহাদাত কাজে-কর্মে অভিজ্ঞ, এ জন্য তাকে রাখা হয়েছে। ঘুরেফিরে এক জায়গায় আট বছর থাকার বিষয়টি হেডকোয়ার্টার বলতে পারবে, আমি জানি না। মাদকের বিষয়টি ক্রাইম শাখা বলতে পারবে।”
তদন্তের দাবি
এখন দেখার বিষয়-বছরের পর বছর ধরে চলা এই পদায়ন-রহস্যের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি অন্য কোনো হিসাব কাজ করছে।