আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়েও বিচার বিভাগের কিছু সদস্যের দায় বেশি ছিল। তাঁর দাবি, বিচার বিভাগ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যার ওপর ভর করেই দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তি পূজা, চাটুকারিতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে তিনি রাষ্ট্রীয় সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শনিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, “শেখ হাসিনার চেয়ে যদি কারও বেশি অপরাধ থেকে থাকে, তাহলে বিচারপতিদের দায় আরও বেশি। বিচার বিভাগই সেই পরিবেশ তৈরি করেছিল, যার ফলে দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।”
তিনি বলেন, বিচারপতিদের এমন ভূমিকার পেছনে ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতি বড় ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, এ সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা দুর্বল করে দিয়েছে।
বিচার বিভাগের সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ক্ষমতায় গেলে অনেকের চরিত্র বদলে যায়। উদাহরণ টেনে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় কয়েক দিন পুলিশ না থাকলেও দেশে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। তাঁর ভাষায়, এটি প্রমাণ করে বাংলাদেশের মানুষকে যতটা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবে তারা তার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গণে হামলার শিকার হলেও বিচার বিভাগ বা সুশীল সমাজের কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ পাননি। তিনি জানান, তাঁর বিরুদ্ধে একসময় ১২৫টি মামলা ছিল। বিভিন্ন জেলায় এসব মামলায় হাজিরা দিতে হতো। মামলাগুলো ঢাকায় স্থানান্তরের আবেদন করলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, হামলার পরদিনও সুনামগঞ্জে আদালতে হাজিরা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। এ অবস্থায় আগাম জামিন চাইতে গেলে হাইকোর্টের এক বিচারপতি তাঁকে বলেন, “আপনার চেহারা দেখতে আমাদের ভালো লাগে না। আপনি আর কখনো হাইকোর্টে আসবেন না।” এই অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের সে সময়কার অবস্থার এটিই একটি উদাহরণ।
ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতির সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরাও অনেক সময় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একজন রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যের কথা বলেছিলেন, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবগতভাবে খারাপ নয়; তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যক্তি পূজা ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। তাঁর দাবি, তিনি সব সময় অপ্রিয় সত্য কথা বলায় অনেকের অপছন্দের ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন।
নিজেকে একজন ভুক্তভোগী উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি আর সৃষ্টি না হয়, সে জন্য অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং অন্য ভুক্তভোগীদেরও সত্য তথ্য দিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
‘আমার দেশ’ পত্রিকার ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একসময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জনসভায় পত্রিকাটির সংবাদ উদ্ধৃত করতেন। সে সময় সরকারপক্ষ ‘আমার দেশ’কে বিএনপির ঘনিষ্ঠ পত্রিকা হিসেবে আখ্যায়িত করে নির্যাতনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে মাহমুদুর রহমান বলেন, অনেকেই যখন বিষয়টি নিয়ে নীরব ছিলেন, তখন ‘আমার দেশ’ প্রথম এটিকে ফ্যাসিবাদের পূর্বাভাস হিসেবে তুলে ধরেছিল। তাঁর দাবি, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সেই মূল্যায়নকে সত্য প্রমাণ করেছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের বক্তব্য প্রকাশে ‘আমার দেশ’ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রকে অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে অনেক গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে পারে না। তবে ‘আমার দেশ’-এর কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ না থাকায় তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে বলে দাবি করেন।
বিএনপির সঙ্গে পত্রিকার সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একসময় ‘আমার দেশ’কে বিএনপির ঘনিষ্ঠ পত্রিকা বলা হলেও বর্তমানে সরকারকে সমালোচনা করায় একই দল তাদের জামায়াতপন্থী পত্রিকা বলে আখ্যা দিচ্ছে। তাঁর মতে, ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর সমালোচনা সহ্য করতে না পারার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘নেভার এগেইন’ স্লোগান দেওয়া হলেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখনো মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বর্তমান ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেন।
বাংলাদেশে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে তিনি তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রথমত, দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সরকারকে যুক্তিসংগত সমালোচনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, যারা দীর্ঘদিন ভুক্তভোগী ছিলেন, তারা যেন ক্ষমতায় গিয়ে নিজেরাও নিপীড়নের পথ অনুসরণ না করেন।
বক্তব্যের শেষ দিকে মাহমুদুর রহমান বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে একসময় ১২৫টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ৬৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ৫০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার চাইলে এসব মামলায় যেকোনো সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারে এবং সে জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন।