মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, পরিবারের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায়, দুই বছর পর পাহাড়ি এলাকা থেকে কঙ্কাল উদ্ধার, বিদেশে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিতকরণ, পুলিশের ৯ কর্মকর্তার দীর্ঘ তদন্ত, একের পর এক আইনি জটিলতা, নারাজি আবেদন, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ—সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত একটি হত্যা মামলার প্রায় সব নাটকীয় উপাদানই রয়েছে এতে। কিন্তু ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলার বিচার।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, নিহতের পরিবার এখন আর চলমান বিচার প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখে না। তাদের অভিযোগ, যাদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ উঠেছিল এবং যাদের নাম আসামিদের জবানবন্দিতেও এসেছে, তদন্তে তাদের অনেককেই বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় না এনে যে বিচার চলছে, তা তাদের কাছে অর্থহীন।
ব্যস্ত নগর থেকে রহস্যময় অপহরণ
২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফিরছিলেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন সহসভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চৌধুরী। আনোয়ারা আসন থেকে বিএনপির সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবেও সে সময় তাঁর নাম আলোচনায় ছিল।
বাড়ি ফেরার পথেই তাকে অপহরণ করা হয়। কিছুক্ষণ পরই পরিবারের কাছে আসে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবি। প্রশাসনের পরামর্শে শেষ পর্যন্ত অপহরণকারীদের ২৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু মুক্তিপণের অর্থ নিয়েও জামাল উদ্দিনকে আর জীবিত ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার শুরুতেই পুলিশ এটিকে গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি প্রথমদিকে ঘটনাটিকে সাজানো নাটক বলেও মন্তব্য করা হয়েছিল। মামলা নিতেও গড়িমসি করা হয়। পরে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা রেকর্ড করা হয়।
দুই বছর পর উদ্ধার হয় কঙ্কাল
অপহরণের প্রায় দুই বছর পর, ২০০৫ সালে আনোয়ারা সদর ইউনিয়নের সাবেক সদস্য মো. শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই বছরের ২৪ আগস্ট ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে র্যাব জামাল উদ্দিনের কঙ্কাল উদ্ধার করে।
পরে কঙ্কালটি সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটি জামাল উদ্দিন চৌধুরীরই মরদেহ।
জবানবন্দিতে উঠে আসে অপহরণের চাঞ্চল্যকর বর্ণনা
মামলার দুই আসামি শহীদুল ইসলাম ও মাহবুব আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অপহরণ ও হত্যার পুরো ঘটনার বিবরণ দেন। সেখানে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ২৫ লাখ টাকা গ্রহণ এবং অপহরণে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়।
২০০৫ সালের ৩১ আগস্ট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শহীদুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। পরে নাজিম, হেলাল ও অমর নামের ব্যক্তিরা মোবাইল ফোনে ২৫ লাখ টাকায় সমঝোতার বিষয়টি জানান।
নিহতের পরিবারের দাবি, ওই জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের অনেককেই পরবর্তী তদন্তে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ফলে শুরু থেকেই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
৯ তদন্ত কর্মকর্তা, তবু শেষ হয়নি তদন্ত বিতর্ক
এই মামলার তদন্ত করেছেন পুলিশের মোট নয়জন কর্মকর্তা। প্রায় সাড়ে তিন বছর তদন্ত শেষে ২০০৬ সালে সিআইডি ২৪ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আনোয়ারার বর্তমান সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম এবং তাঁর ভাই মারুফ নিজাম।
অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নিহতের বড় ছেলে ও মামলার বাদী চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন আদালতে নারাজি আবেদন করেন। এরপর মামলাটি দীর্ঘ আইনি জটিলতায় আটকে যায়। রাজসাক্ষী করার প্রশ্নে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, লিভ টু আপিলসহ নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে প্রায় এক দশক পর, ২০১৬ সালে মামলাটি আবার বিচারিক ধারায় ফিরে আসে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত সিআইডির অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন এবং নারাজি আবেদন খারিজ করে দেন। পরের বছর ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
কিন্তু বিচার শুরুর আট বছর পরও মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায় অতিক্রম করতে পারেনি।
৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র তিনজন
আদালত সূত্র জানায়, মামলায় ৮৪ জন সাক্ষী থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
গত ২০ মে সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ জুলাই।
বর্তমানে ১৪ আসামির মধ্যে ১০ জন জামিনে, একজন কারাগারে এবং চারজন পলাতক রয়েছেন।
নয় বছর ধরে আদালতে যাচ্ছেন না বাদী
মামলার বাদী চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন গত নয় বছর ধরে আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর থানা, আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু যাদের তিনি প্রকৃত আসামি মনে করেন, তারা মামলার বাইরে থেকে গেছেন।
তার ভাষায়, “মূল আসামিদেরই বাদ দেওয়া হয়েছে। বারবার নারাজি দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। তাই আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।”
তিনি আরও দাবি করেন, আসামিদের জবানবন্দিসহ সবাই জানেন কারা এবং কেন তাঁর বাবাকে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেও একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় তিনি বিষয়টি নিয়ে এগোতে পারেননি। এখন নতুন করে প্রকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
জামাল উদ্দিন হত্যা মামলায় নাম জড়ানোর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এর আগে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, তদন্তে তার নাম আসেনি এবং এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অন্যদিকে, এক আসামির জবানবন্দিতে নাম আসা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং তিনিও এ হত্যার বিচার চান।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া বলেন, জামাল উদ্দিন দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তাকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত।
বিচার দেখে যেতে পারেননি ছোট ছেলে
বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো, জামাল উদ্দিনের ছোট ছেলে চৌধুরী আরমান রেজা বাবার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি মারা যান।
নিহতের স্ত্রী নাজমা আক্তার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকৃত আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত থেকে বেরিয়ে গেছেন। এখন সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তার অভিযোগ, আনোয়ারা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ায় রাজনৈতিক কারণেই তাঁর স্বামীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অধিকতর তদন্তের সুযোগ এখনো আছে
আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের কাছে অধিকতর তদন্তের আবেদন করার সুযোগ এখনো রয়েছে। এর আগে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা এবং চট্টগ্রাম বন্দরে কোকেন জব্দের মতো আলোচিত মামলাতেও অতিরিক্ত তদন্তের নজির রয়েছে।
তবে নিহতের পরিবার এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
২৩ বছরের প্রশ্ন—বিচার কি আদৌ হবে?
জামাল উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলা আজ শুধু একটি অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলা নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্ত নিয়ে বিতর্ক এবং একটি পরিবারের দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষার প্রতীক।
মুক্তিপণের টাকা দিয়েও স্বামীকে ফিরে পাননি নাজমা আক্তার। বাবার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি ছোট ছেলে। বড় ছেলে দীর্ঘদিন আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। ২৩ বছর পর এসে পরিবারের একটাই দাবি—কোনো আপসের বিচার নয়, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করা হোক।
প্রশ্ন রয়ে গেছে—দেশের বহুল আলোচিত এই অপহরণ ও হত্যা মামলার প্রকৃত বিচার কি কখনো শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে, নাকি এটি বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে?