THE B NEWS 24

সন্ধ্যা ৭:৫১ - রবিবার - ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
সন্ধ্যা ৭:৫১ - রবিবার - ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
জাতীয় সর্বশেষ

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, শেখ হাসিনার অবস্থান ও আঞ্চলিক কূটনীতি: রাজনৈতিক চাপের কৌশল কতটা বাস্তব?

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানিবণ্টন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং কৌশলগত স্বার্থ-সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বরাবরই বহুমাত্রিক। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিতর্ক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি বড় রাজনৈতিক মহল মনে করে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান শুধু মানবিক বা নিরাপত্তাজনিত বিষয় নয়; বরং এটি ভারতের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশেরও একটি অংশ। অন্যদিকে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে খুব সীমিত মন্তব্য করেছে এবং বিষয়টিকে দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-ভারত কি সত্যিই শেখ হাসিনার উপস্থিতিকে একটি কূটনৈতিক লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, নাকি এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা?

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব বলছে, প্রতিটি রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; বরং নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে-এটাই স্বাভাবিক। কারণ বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল। সীমান্ত সন্ত্রাস দমন, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। ফলে সেই সরকারের পতনের পর ভারতের নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশের একটি অংশের বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ভারতের জন্য একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সম্পদ হতে পারে। তাঁদের যুক্তি, কোনো দেশের সাবেক সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়া ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে আলোচনার একটি উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে যদি সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিজ দেশে বিচারিক বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তাহলে তাঁর অবস্থান দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।

অন্যদিকে অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এই ব্যাখ্যাকে অতিসরলীকৃত বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে তা একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ সীমিত। দুই দেশের মধ্যে শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্য, বিদ্যুৎ আমদানি, ট্রানজিট, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প-এসবই দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রিক স্বার্থের অংশ। ফলে ভারতের নীতিনির্ধারণে শেখ হাসিনার উপস্থিতি একটি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র বা প্রধান নিয়ামক-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে গড়ে তুলতে চায় বলে বিভিন্ন বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ অবস্থায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতি। কোনো রাষ্ট্র যদি অন্য একটি দেশের সাবেক শীর্ষ নেতাকে আশ্রয় দেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তা, মানবিক বিবেচনা বা কূটনৈতিক কারণ থাকতে পারে। একই সঙ্গে সেই ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা হবে কি না, তা নির্ভর করে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন দিকের ওপর। তাই বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়; এর সঙ্গে আইনি জটিলতাও জড়িত।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ব্যক্তি-নির্ভরতার বাইরে নিয়ে যাওয়াই উভয় দেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক; সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কের ভিত্তি সম্পূর্ণ বদলে গেলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে ভারত স্বাভাবিকভাবেই চায়, বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূল একটি প্রতিবেশী হিসেবে থাকুক। একইভাবে বাংলাদেশও চায়, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে।

সবশেষে বলা যায়, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও জল্পনা থাকলেও ভারত তাঁর উপস্থিতিকে বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে-এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পর্যাপ্ত ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এটিও সত্য যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিটি বিষয়ই কখনও কখনও আলোচনার উপাদান হয়ে উঠতে পারে। তাই এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক পদক্ষেপ, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।

বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া। ব্যক্তি বা দল নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থই শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *