THE B NEWS 24

সন্ধ্যা ৭:৫৮ - রবিবার - ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
সন্ধ্যা ৭:৫৮ - রবিবার - ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
চট্টগ্রাম সর্বশেষ

চুলা নিভেছে, কারখানা থেমেছে; গ্যাসের সংকটে চট্টগ্রাম

কয়েক দিনের স্বস্তির পর আবারও তীব্র গ্যাস সংকটে পড়েছে চট্টগ্রাম। গত মঙ্গলবার রাত থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের চুলা জ্বলছে না। কোথাও কোথাও দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের দেখা মিলছে না। অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন গ্যাসচালিত যানবাহনের চালকেরা।

গ্যাস সংকটের বড় ধাক্কা এসেছে শিল্প খাতেও। সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ভারী শিল্পকারখানার অনেক মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)।

কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরবরাহ নেমে এসেছে সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আবাসিক, পরিবহন, শিল্প ও বাণিজ্যিক-সব খাতেই।

ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি

গতকাল নগরের ষোলোশহর, টাইগারপাসসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা গেছে দীর্ঘ সারি। গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে চালকদের অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হয়েছে।

মোহাম্মদ নোমান নামের এক অটোরিকশাচালক বলেন, সকাল ৭টার দিকে ষোলোশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস পাননি। পরে টাইগারপাসসহ কয়েকটি স্টেশনে ঘুরেও গ্যাসের সন্ধান মেলেনি।

নোমানের ভাষ্য, ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ থাকলেও চাপ অত্যন্ত কম। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। এতে স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

চালকদের অভিযোগ, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় একদিকে তাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রী পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক চালক একাধিক স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

বৈরী আবহাওয়ায় আটকে এলএনজি জাহাজ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন কার্গো জাহাজ ভিড়তে না পারা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে একটি টার্মিনালের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব জানান, এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। সাধারণত বাতাসের গতি ২০ নটের মধ্যে থাকলে জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট হওয়ায় নিরাপত্তার কারণে জাহাজটি টার্মিনালে নেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি জানান, বর্তমানে মহেশখালীর টার্মিনালগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে।

ভারী শিল্পে উৎপাদন বন্ধের শঙ্কা

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। চট্টগ্রামের সিইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, কালুরঘাট, সীতাকুণ্ড, নাসিরাবাদ ও পতেঙ্গা শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্পকারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকলে বয়লার ও বিভিন্ন ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যায় না। ফলে উৎপাদন বন্ধ রাখা ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের সামনে বিকল্প থাকছে না।

কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, সংকট সামাল দিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ভারী শিল্পকারখানাগুলোকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন পরিকল্পনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ অব্যাহত থাকে। দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চললে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতি বাড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানি আদেশ পূরণেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

আগের সংকট কাটতে না কাটতেই ফের ধাক্কা

এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে টার্মিনালের একটি বয়লার চালু করে আংশিক সরবরাহ শুরু করা হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। ধীরে ধীরে ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনেও কমতে শুরু করে দীর্ঘ লাইন।

কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। নতুন করে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সরবরাহ আবারও কমে গেছে। ফলে কয়েক দিনের ব্যবধানেই চট্টগ্রামবাসীকে নতুন করে গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

আবাসিক জীবনেও চরম ভোগান্তি

শিল্প ও পরিবহন খাতের পাশাপাশি গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, সকাল ও সন্ধ্যার রান্নার সময়ে চুলায় গ্যাস না থাকায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সংকট কাটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবহাওয়ার উন্নতি। বাতাসের গতি কমে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে পারলেই গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। তার আগে পর্যন্ত চট্টগ্রামকে চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

সব মিলিয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানেই গ্যাস সংকট আবারও চট্টগ্রামের জনজীবন ও শিল্প অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। আবাসিক চুলা থেকে শুরু করে সিএনজি স্টেশন এবং শিল্পকারখানা-সবখানেই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়ে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্য খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *