চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকায় প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল (গ্যাস অয়েল) বহনকারী তেলবাহী ট্যাংকার এমটি সি স্পাইক ও নোঙর করে থাকা বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি সান শাইন-এর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তীব্র স্রোতের কারণে এমটি সি স্পাইকের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা সম্ভব না হওয়ায় নোঙর করে থাকা এমভি সান শাইনের সঙ্গে সেটির সংঘর্ষ হয়। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তেল ছড়িয়ে পড়েনি, বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে
দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, তেলবাহী ট্যাংকারটির কার্গো ট্যাংকগুলো অক্ষত রয়েছে। কোনো কার্গো ট্যাংকে পানি প্রবেশ করেনি এবং এখন পর্যন্ত জাহাজ থেকে কোনো ধরনের তেল নিঃসরণের ঘটনাও ঘটেনি।
ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে সম্ভাব্য তেল দূষণ ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইঞ্জিন রুমে ফাটল, দেখা দেয় ব্ল্যাকআউট
সংঘর্ষে এমটি সি স্পাইকের ইঞ্জিন রুমের পোর্ট কোয়ার্টার অংশে আনুমানিক এক বর্গমিটার জায়গাজুড়ে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ওই ফাটল দিয়ে জাহাজের ভেতরে পানি প্রবেশ করায় সাময়িকভাবে ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জাহাজটির জরুরি ব্যাটারি চালু রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে জাহাজের ভিএইচএফ যোগাযোগব্যবস্থা সচল রয়েছে। ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের মাস্টারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পারছে।
জাহাজটিকে স্থিতিশীল রাখতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। দুটি নোঙরের প্রতিটিতে ১০ শ্যাকেল করে ক্যাবল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জোয়ার-ভাটার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভাটার সময়ও জাহাজটি নিরাপদে ভেসে থাকবে।
প্রাথমিকভাবে তাই জাহাজটি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্রুত তেল খালাসের উদ্যোগ
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ কাজে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডও যুক্ত হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের টাগবোট কান্ডারী-৮ ইতোমধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাকবলিত ট্যাংকার থেকে দ্রুত জ্বালানি তেল খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য জাহাজটির শিপিং এজেন্ট প্রাইড শিপিংকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের ফাটল মেরামত ও প্রয়োজনীয় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি স্যালভেজ কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মূল চ্যানেলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক
বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জাহাজের কার্গো নিরাপদ রাখা এবং সম্ভাব্য তেল দূষণ প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভিএইচএফ যোগাযোগের মাধ্যমে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে সংঘর্ষের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল চ্যানেলে জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়নি। বন্দরের চ্যানেলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তদন্তে বের হবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ
দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, জাহাজ দুটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে তদন্ত ও উদ্ধার কার্যক্রম চলছে।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ হলে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। আপাতত দুর্ঘটনাকবলিত ট্যাংকারের কার্গো নিরাপদ রাখা, জাহাজটিকে স্থিতিশীল রাখা এবং কোনো ধরনের তেল দূষণ যাতে না ঘটে, সেদিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলবাহী একটি ট্যাংকারের সঙ্গে নোঙর করা জাহাজের সংঘর্ষে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হলেও কার্গো ট্যাংক অক্ষত থাকায় আপাতত সেই ঝুঁকি এড়ানো গেছে। তবে জাহাজের ইঞ্জিন রুমে ফাটল ও পানি প্রবেশের ঘটনায় দুর্ঘটনার গুরুত্ব কমছে না। উদ্ধার ও মেরামত কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত জাহাজটির নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।