নদীর পানিতে পড়ে আছে বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা একাধিক বোট। ফিশিং বোট, কার্গো বোট, ইঞ্জিনচালিত বোট ও স্পিডবোট-সবই এখন আদালতে চলমান মামলার আলামত। এসব বোটের মালিকরা এখনও আদালত থেকে বোট ফেরত পাননি। কিন্তু এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের হেফাজতে থাকা এসব বোটের বড় ইঞ্জিন, প্রপেলারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
মামলা আদালতে চলমান, পুলিশের হেফাজতে থাকা আলামত খুলে বিক্রির অভিযোগ। ১১ নম্বর ঘাটে পড়ে আছে বোট, নেই ইঞ্জিন-যন্ত্রাংশ; অভিযোগের তীর কয়লার ডিপো ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের দিকে
ঘটনাস্থল পতেঙ্গা থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার বোট ক্লাবের পাশে ১১ নম্বর ঘাটসংলগ্ন নদী এলাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা বোটগুলো এখানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। এর মধ্যে নদীতে ডাকাতির কাজে ব্যবহারের অভিযোগে র্যাবের হাতে আটক আনোয়ারার দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামি বদুনী মেম্বারের ছেলে আক্তারের ফিশিং বোটও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বোটগুলো আদালতে মামলার আলামত হিসেবে চলমান থাকা অবস্থাতেই সেগুলোর ইঞ্জিন ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হয়েছে। পরে এসব মালামাল নদীপথে ১৪ নম্বর ঘাট দিয়ে তুলে ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর এবং দ্বিতীয় কর্মকর্তা এএসআই শম্ভুনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ নম্বর ঘাটসংলগ্ন নদীতে বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা বোটগুলো রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন নদীতে থাকায় এসব বোটের গায়ে ময়লা, শ্যাওলা ও মাটি জমেছে। অনেক বোটই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার পথে। কিন্তু এসব বোট নিয়ে মামলা আদালতে চলমান থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, বোটের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়ে তৎপরতা চালানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকটি বোটের বড় ইঞ্জিন, ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও প্রপেলার খুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে-আদালতের মামলায় আলামত হিসেবে থাকা বোট থেকে ইঞ্জিন খুলে নেওয়া হলে মামলার আলামতের বর্তমান অবস্থা কী? অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বোটগুলোর একটি হলো বদুনীর ছেলে আক্তারের ফিশিং বোট। নদীতে ডাকাতির কাজে ব্যবহারের অভিযোগে র্যাব তাকে আটক করেছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। পরে বোটটি মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়।
মামলাটি এখনও আদালতে চলমান। ফলে বোটটি আদালতের অনুমতি ছাড়া অন্যত্র সরানো, এর কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুলে নেওয়া বা বিক্রি করা হয়েছে কি না-এটি তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই বোটের বড় ইঞ্জিনসহ অন্যান্য বোটের ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশও খুলে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১১ নম্বর ঘাটে থাকা বোট থেকে খুলে নেওয়া ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ পরে ১৪ নম্বর ঘাট দিয়ে তুলে নেওয়া হয়। এরপর এসব মালামালের একটি অংশ কয়লার ডিপো এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী আক্কাস আলীর কাছে এবং অন্য অংশ মাতব্বর ঘাট এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী ইব্রাহিমের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বোটগুলো এখনও আদালতের মামলার আলামত। আদালত থেকে সেগুলো মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই বোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুলে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এতে শুধু বোটের মালিকের আর্থিক ক্ষতির প্রশ্ন নয়, মামলার আলামত সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ কোনো মামলার আলামত পরিবর্তিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে আদালতে সেটি উপস্থাপনের সময় প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে জব্দের সময়কার অবস্থার পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

বোট মালিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছে, আদালত থেকে বোট ফেরত পাওয়ার আগেই যদি এর গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন বা যন্ত্রাংশ না থাকে, তাহলে আদালত থেকে বোট বুঝে নেওয়ার সময় তারা কী পাবেন? সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মামলার আলামত হিসেবে থাকা অবস্থায় বোটের যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হলে পরবর্তীতে বোট মালিকদের কাছে হস্তান্তরের সময় প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে জব্দের সময়কার অবস্থার বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিতে পারে। তাই এখনই বোটগুলোর বর্তমান অবস্থা নথিভুক্ত করা, ছবি ও ভিডিও ধারণ করা এবং জব্দ তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা আরেকটি প্রশ্ন হলো-বোটগুলো পুলিশের হেফাজতে থাকার সময় সেগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে কারা ছিলেন। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর ও দ্বিতীয় কর্মকর্তা এএসআই শম্ভুনাথের বিরুদ্ধে সরাসরি যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি তদন্তে জব্দ তালিকা, মামলার এজাহার, আদালতের নথি, বোটের বর্তমান অবস্থা এবং জব্দের সময়কার ছবি বা ভিডিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা মামলার আলামত নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তাই পুরো ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন তারা।