THE B NEWS 24

সন্ধ্যা ৭:৫৮ - রবিবার - ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
সন্ধ্যা ৭:৫৮ - রবিবার - ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
চট্টগ্রাম সর্বশেষ

ইলিশে সাফল্য, জাটকা রক্ষায় এখনও বড় চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রামের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে চলতি মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মৎস্য বিভাগের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে পর্যন্ত চট্টগ্রামে নদীর সাতটি চ্যানেল ও উপকূলীয় এলাকায় মোট ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৯৬৩টি ইলিশ আহরণ হয়েছে, যার ওজন প্রায় ২৪৫ দশমিক ২৮০ মেট্রিক টন। একই সময়ে আগের বছরের তুলনায় ইলিশ আহরণের পরিমাণও বেড়েছে। তবে এর বিপরীতে জাটকা নিধন ঠেকাতে পরিচালিত অভিযানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছে সন্দ্বীপ এলাকায়। সেখানে মেঘনা নদী ও সন্দ্বীপ চ্যানেল থেকে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫০টি ইলিশ ধরা পড়ে, যার পরিমাণ প্রায় ১৩৩ দশমিক ৭৯৩ মেট্রিক টন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আনোয়ারা উপজেলা। কর্ণফুলী নদী ও সাগর উপকূল থেকে সেখানে ১ লাখ ৫ হাজার ৮৮৫টি ইলিশ আহরণ হয়েছে, যার ওজন ৩৫ দশমিক ৬৮০ মেট্রিক টন। মহেশখালী উপকূলে বঙ্গোপসাগর থেকে ধরা পড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ইলিশ, যার ওজন ৩২ দশমিক ৭৫০ মেট্রিক টন। বাঁশখালীতে কুতুবদিয়া চ্যানেল ও সাংগু নদী থেকে ৮৮ হাজার ২৫৯টি এবং সীতাকুণ্ডে সন্দ্বীপ চ্যানেল থেকে ৩৩ হাজার ৬৮৯টি ইলিশ আহরণ হয়েছে। কর্ণফুলী উপজেলায় ওই সময়ে কোনো ইলিশ আহরণের তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইলিশ আহরণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর পেছনে সরকারি অভয়াশ্রম কর্মসূচি, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তবে উৎপাদনের এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে জাটকা সংরক্ষণে মাঠপর্যায়ের অভিযান খুব বেশি জোরালো ছিল না। জেলা মৎস্য বিভাগের পৃথক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুরো চট্টগ্রাম জেলায় মাত্র ২৬টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে ৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় এবং মোট ৪ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। জব্দ করা হয় প্রায় ২ দশমিক ৬৩১ মেট্রিক টন জাটকা।

অভিযানের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, কার্যত সব অভিযানই পরিচালিত হয়েছে মহেশখালী উপজেলায়। সেখানে পাঁচটি অভিযানে ১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। জব্দ করা হয় প্রায় ২ দশমিক ৬৩১ মেট্রিক টন জাটকা, আটজনকে সাজা দেওয়া হয় এবং ৪ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। অন্যদিকে চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, রাউজান, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, কর্ণফুলী ও চন্দনাইশসহ অধিকাংশ উপজেলায় ওই মাসে কোনো জাটকা জব্দ, মামলা কিংবা জরিমানার তথ্য নেই।

মৎস্য খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে শুধু মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা নয়, সারা বছর জাটকা নিধন বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ একটি জাটকা বড় হয়ে পরিণত ইলিশে রূপ নিলে তার অর্থনৈতিক মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে অল্প বয়সে জাটকা নিধন দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও প্রজননের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জেলেদের একটি অংশের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই জীবিকার তাগিদে তারা নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরতে বাধ্য হন। বিকল্প কর্মসংস্থান ও সরকারি খাদ্যসহায়তা যথাসময়ে নিশ্চিত করা গেলে জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে নদী ও সাগর উপকূলে নিয়মিত টহল এবং অবৈধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ফলে এখানে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে হলে সংরক্ষণ ও আইন প্রয়োগ-দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একদিকে যেমন অভয়াশ্রম রক্ষা ও প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, অন্যদিকে জাটকা নিধন, অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং নিষিদ্ধ সময়ে মাছ আহরণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইলিশ উৎপাদনের সাম্প্রতিক ইতিবাচক প্রবণতা দেশের মৎস্য অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও, জাটকা সংরক্ষণে আরও সমন্বিত ও বিস্তৃত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, “চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামের নদী ও উপকূলীয় এলাকায় ইলিশের উৎপাদন সন্তোষজনক হারে বেড়েছে। এর পেছনে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময় কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারের বিভিন্ন সংরক্ষণ কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তবে ইলিশের এই ধারা ধরে রাখতে হলে জাটকা নিধন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। জাটকা রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে। এ জন্য আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করতে কাজ করছি। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার ও অবৈধভাবে জাটকা আহরণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।”

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *