THE B NEWS 24

সন্ধ্যা ৭:৪৭ - বুধবার - ২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৫ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
সন্ধ্যা ৭:৪৭ - বুধবার - ২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৫ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আদালত জাতীয় সর্বশেষ

পিলখানা হত্যাকাণ্ড:প্রমাণ মিলেছে উপস্থিত ছিল ৮২৭ ভারতীয়, হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। ওই ঘটনার প্রায় ১৬ বছর পর গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনা, একটি সমান্তরাল কমান্ড কাঠামো এবং ভারতের সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে। তবে গত বছরের ৩০ নভেম্বর সরকারের কাছে ২১১ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও আট মাস পেরিয়ে গেলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে, ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন কিংবা প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো নতুন ফৌজদারি ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনরা।

২১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন, ৩০০-এর বেশি সাক্ষ্য

তদন্ত কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর মেজর জেনারেল (অব.) এ এল এম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, প্রতিবেদনটি “আনক্লাসিফায়েড” হওয়ায় সরকার চাইলে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারে।

১১৪ কর্মদিবস ধরে পরিচালিত তদন্তে ৩০০-এর বেশি ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্য, জীবিত সেনা কর্মকর্তা, কারাবন্দি বিডিআর সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিক। তদন্তের স্বার্থে ৩৩ জনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছয়টি দেশের দূতাবাস এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কাছেও তথ্য চাওয়া হয়।

কমিশনের প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে

কমিশনের সদস্য অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম দাবি করেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে পিলখানার ঘটনা ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে রাজনৈতিক ও বিদেশি শক্তির ভূমিকা ছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় সেনাবাহিনীর স্বাভাবিক চেইন অব কমান্ড অকার্যকর করে একটি সমান্তরাল কমান্ড কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক সেনাবাহিনীর নিয়মিত কমান্ডকে পাশ কাটিয়ে বাহিনীকে অগ্রসর হতে বাধা দেন। একই সময়ে তিন বাহিনীর প্রধানকে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রাখা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৮২৭ ভারতীয় নাগরিকের উপস্থিতির দাবি

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নথি পর্যালোচনায় পিলখানায় ৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারীর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কমিশন ভারতের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের সুপারিশে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে ভারতের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়ার এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে ঘটনার “প্রধান সমন্বয়ক” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার অনেক আগে থেকেই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাধিক গোপন বৈঠক হয়েছিল।

এছাড়া প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক ডিজিএফআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরসহ কয়েকজনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

৭০টির বেশি সুপারিশ, বাস্তবায়ন হয়নি একটিও

কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ৭০টির বেশি সুপারিশ করলেও এখন পর্যন্ত একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদন প্রকাশ কিংবা বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের বিষয়ে সরকারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

সরকারের অবস্থানে বিভ্রান্তি

তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকেও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, বিডিআর বিদ্রোহ পুনঃতদন্তে নতুন কমিশন গঠন করা হবে। তবে মাত্র দুই দিন পর, ২৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ সেনা দিবসে তিনি বলেন, সরকার নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করবে না।

 শহীদ পরিবারের ক্ষোভ

শহীদ মেজর তানভীর হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা বলেন, ঘটনার দিন তার স্বামী ফোনে বিডিআরের পোশাকে ভারতীয় ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি) সদস্যদের উপস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন। তার দাবি, বর্তমান তদন্ত প্রতিবেদনেও ভারতীয় সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি আরও বলেন, তার স্বামীর মরদেহ এখনো উদ্ধার হয়নি এবং তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে গুমের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

শহীদ পরিবারের সদস্যরা অবিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া এবং সাক্ষী ও শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *