চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা থানাধীন কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীরের বিরুদ্ধে জব্দকৃত সার বিক্রি, ফাঁড়ি এলাকার বিভিন্ন স্পট থেকে চাঁদাবাজি, কোস্ট গার্ডের জব্দ করা নৌযান টাকা নিয়ে জিম্মায় দেওয়া এবং বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা ইঞ্জিনচালিত বোটের কার্গো বোটের ইঞ্জিন বিক্রিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও সংবাদ প্রকাশের পরও এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর এখনো একই ফাঁড়িতে দায়িত্ব পালন করায় প্রশ্ন উঠেছে-তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? তার ‘খুঁটির জোর’ই বা কোথায়?
অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের কয়েকটি ঘটনায় ফাঁড়ির টু-আইসি এএসআই শম্ভুনাথের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অন্যত্র বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নজিবুল ইসলাম তানভীরের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কোস্ট গার্ডের জব্দ করা মালামাল নিয়ে প্রশ্ন
এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো কোস্ট গার্ডের মাধ্যমে জব্দ করা বিভিন্ন মালামাল ও নৌযান সংক্রান্ত মামলায় অনিয়ম। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর আলামত ও জব্দ করা মালামাল নিয়ে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষ ক্ষমতা আইনে পতেঙ্গা মডেল থানায় করা একটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। পতেঙ্গা মডেল থানার মামলা নম্বর-১১, তারিখ ১৩ মে ২০২৬-এর মামলায় কোস্ট গার্ড কর্তৃক জব্দ করা ১৭ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল এবং দুটি অয়েল ট্যাংকার ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ মামলায় আসামিপক্ষের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মামলা নম্বর-১৩, তারিখ ১১ জুন ২০২৬-এ কোস্ট গার্ড কর্তৃক জব্দ করা একটি লাইফবোট, প্রায় ১ হাজার লিটার লুব্রিক্যান্ট ও অন্যান্য মালামাল সংক্রান্ত মামলাতেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আরেকটি ঘটনায় মামলা নম্বর-২৭, তারিখ ২৬ এপ্রিল ২০২৬-এ কোস্ট গার্ড কর্তৃক জব্দ করা ২১৫ বোতল চাইনিজ সাইজি মদ-সংক্রান্ত মামলায়ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
উৎকোচ নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন-অভিযোগের তদন্ত দাবি
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা মালামালের প্রকৃতি, পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে যথাযথ তদন্ত না করে প্রভাবশালী বা বিবাদী পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের প্রশ্ন, কোনো মামলায় কোস্ট গার্ড জব্দকারী সংস্থা হিসেবে থাকলে পরবর্তী সময়ে পুলিশি তদন্তে জব্দ মালামালের হিসাব, আলামত সংরক্ষণ এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তি কী ছিল-এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে কি না।
ফাঁড়ি এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ
এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীরের বিরুদ্ধে কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির আওতাধীন বিভিন্ন স্পট থেকে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, ফাঁড়ির আওতাধীন বিভিন্ন ব্যবসা ও পরিবহনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে পুলিশের প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
তবে অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসতে অনীহা রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগের কথা প্রকাশ পেলে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে পারেন তারা।
জব্দকৃত সার বিক্রির অভিযোগ
এর আগে জব্দ করা সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে এসআই নজিবুল ইসলাম তানভীরের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তার ফল কী এবং তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-এসব তথ্যও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
বোটের ইঞ্জিন বিক্রির অভিযোগ
বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা ইঞ্জিনচালিত বোটের কার্গো বোটের ইঞ্জিন বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব বোট ও ইঞ্জিন মামলার আলামত হিসেবে সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও সেগুলোর হেফাজত, ব্যবহার বা বিক্রির বিষয়ে যথাযথ নথিপত্র আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীরা মনে করছেন, জব্দ করা নৌযান, ইঞ্জিন ও অন্যান্য মালামালের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, জব্দনামা, মামলার নথি এবং পরবর্তী সময়ে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ-সবকিছু যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
একজনের বদলি, আরেকজন বহাল-প্রশ্ন ব্যবসায়ীদের
ফাঁড়ির টু-আইসি এএসআই শম্ভুনাথকে শাস্তিমূলকভাবে অন্যত্র বদলি করা হলেও একই অভিযোগের ধারাবাহিকতায় ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীরের বিরুদ্ধে কেন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না-এ প্রশ্ন এখন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের।
তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠলে শুধু গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও স্পষ্ট করা উচিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হোক। এতে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি প্রকৃত অপরাধীদেরও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।