THE B NEWS 24

রাত ১০:৪৬ - সোমবার - ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ৩রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
রাত ১০:৪৬ - সোমবার - ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ৩রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
চট্টগ্রাম সর্বশেষ

সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক নিহত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে পুরোনো একটি এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অন্তত নয়জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার সকালে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান শুরু করলেও জাহাজের ভেতরে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় পূর্ণাঙ্গ তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। ভাটা শুরু হলে আবারও জাহাজের ভেতরে তল্লাশি চালানোর কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ফলে ভেতরে আরও কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা নিয়ে উৎকণ্ঠা রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আল মামুন জানান, সীতাকুণ্ডে দুটি মরদেহ রয়েছে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ছয়টি মরদেহ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা নয়জন।

নিহত  নয়জন হলেন-নাসির উদ্দিন (৩৮),মনসুর আলী (৪০), হাবিবুর রহমান জিহাদ (৫৩),সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭),মো. খোকন (৪০), মো. রানা (২৭), আব্দুল আলিম সুজন (২৫) ও মতিউর রহমান সাজ্জাদ। মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন আপন দুই ভাই বলে জানা গেছে। খোকন ও রানা গাইবান্ধার বাসিন্দা।

গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যু

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে কুমিরা ফায়ার স্টেশনে ফেরদৌস শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার খবর আসে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট, একটি রেসকিউ ভ্যান ও অ্যাম্বুল্যান্স ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।

তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে তিনটি মরদেহ ও দুইজন আহত শ্রমিককে উদ্ধার করে নিকটস্থ বিএসবিএ হাসপাতালে পাঠান। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় একজন ফোরম্যানকেও উদ্ধার করে অ্যাম্বুল্যান্সে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় লোকজনও কয়েকজনকে উদ্ধার করেন।

তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা আগেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল বলে তারা জানতে পারেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরও গ্যাস বা রাসায়নিকের তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। পরে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় সেই দুর্গন্ধ আর পাওয়া যায়নি।

কার্বন মনোক্সাইডের আশঙ্কা

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, কার্বন মনোক্সাইড অথবা কার্বনজাত কোনো উপজাতীয় গ্যাসের কারণে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে গ্যাসের প্রকৃতি ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি একটি পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজ। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভেতরের গ্যাস, রাসায়নিক ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ সম্পূর্ণ অপসারণ করার কথা।

ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় জাহাজের পাইপ কাটার জন্য কয়েকজন শ্রমিক ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সামনের দিকে থাকা শ্রমিকরা প্রথমে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে আক্রান্ত হন। পরে কিছুটা দূরে থাকা অন্য শ্রমিকরাও গ্যাসে আক্রান্ত হন।

জাহাজের ভেতরে আরও শ্রমিক আটকা?

দুর্ঘটনার পর জাহাজের ভেতরে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার সরঞ্জাম ও অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে ভাটার অপেক্ষায় ছিলেন।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, জাহাজের ভেতরে আরও শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন। পানি নেমে গেলে জাহাজের ভেতরে সর্বশেষ সার্চ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগম বলেন, বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আটজন নিহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাঁদের মরদেহ চমেক হাসপাতালে রয়েছে। আহতদের মধ্যেও কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

‘খুবই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা’

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেন।

এ সময় তিনি বলেন, ‘খুবই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।’

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে সরকারের দায়িত্ব সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বের করে আনা।

মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে গেছে। তারা গ্যাস নির্গমন বন্ধ করার চেষ্টা করছে। শিপব্রেকিং শিল্পে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের মানদণ্ড ও সনদ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

নিহতদের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা চমেক হাসপাতালে গিয়ে নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন এ অর্থ দেবে।

জেলা প্রশাসক জানান, ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর একটি দল এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গেছেন। দুর্ঘটনার কারণ এবং ইয়ার্ডে নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি।

৯ বছর ৯ মাসে নিহত ১৩৭ শ্রমিক

সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিক নিহতের ঘটনা নতুন নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সেন্টার কো-অর্ডিনেটর এবং জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ৯ বছর ৯ মাসে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে নানা দুর্ঘটনায় ১৩৭ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ২৩৯ জন।

তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১৩ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আরও তিনজন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্তকরণ, রাসায়নিক অপসারণ এবং নিরাপত্তা যাচাই না করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। সর্বশেষ দুর্ঘটনাও শিপব্রেকিং শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা, গ্যাসমুক্তকরণ প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।

এখন মূল প্রশ্ন, ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার আগে পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না এবং শ্রমিকদের জাহাজের ভেতরে প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *