চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়িতে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাজী মনিরুল করিমের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযানে উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ ইয়াবা মামলায় কম দেখানো, অবশিষ্ট ইয়াবা আত্মসাৎ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের আটকের পর মামলা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট মামলার বিবরণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৫ আগস্ট একটি খোলা পিকআপ থেকে ৯০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে মাত্র ১০ হাজার পিস। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী, উদ্ধার করা ৮০ হাজার পিস ইয়াবার কোনো হিসাব মামলার নথিতে নেই।
এর আগে ২৪ জুলাইয়ের আরেক অভিযানে ১ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৪০০ পিস। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনায়ও ৯৭ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা মামলার নথির বাইরে থেকে গেছে।
সব মিলিয়ে দুটি অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ থাকা ২ লাখ পিস ইয়াবার মধ্যে মামলায় দেখানো হয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৪০০ পিস। অর্থাৎ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৯০ হাজার ইয়াবা, মামলায় মাত্র ১০ হাজার
গত ৫ আগস্ট পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাজী মনিরুল করিমের নেতৃত্বে একটি খোলা পিকআপে অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অভিযানে ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আবুল কালাম (৩৮) ও হুমায়ুন কবির প্রকাশ মামুনকে (৩৬) গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা নম্বর-৯, তারিখ ৫ আগস্ট ২০২৬ দায়ের করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) এর সারণি ১০(গ)/৩৮/৪১ ধারায় মামলাটি করা হয়।কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে মাত্র ১০ হাজার পিস ইয়াবা। বাকি ৮০ হাজার পিস ইয়াবা কোথায় গেল-এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। একটি অভিযানে ৯০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর মাত্র ১০ হাজার পিস জব্দ দেখানোর বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। জব্দ তালিকা, এজাহার, মালখানা রেজিস্টার এবং আদালতে উপস্থাপিত আলামতের নথি মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
১ লাখ ১০ হাজারের বিপরীতে মামলা ১২ হাজার ৪০০
শুধু ৫ আগস্টের ঘটনাই নয়, এর আগে গত ২৪ জুলাইয়ের আরেকটি অভিযান নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওইদিন ১ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মোহাম্মদ আরিফ (৩৫), শামীম রেজা (৩২), মোহাম্মদ রুবেল (৪২) ও আক্তার হোসেনকে (৩৫) গ্রেপ্তার করা হয়।কিন্তু এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলা নম্বর-৩৮, তারিখ ২৪ জুলাই ২০২৬-এ জব্দ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা।অভিযোগ অনুযায়ী, উদ্ধার করা ১ লাখ ১০ হাজার পিসের মধ্যে ৯৭ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবার কোনো হিসাব মামলায় নেই।এখানেই শেষ নয়। ২৪ জুলাইয়ের ৯৭ হাজার ৬০০ এবং ৫ আগস্টের ৮০ হাজার-দুই ঘটনায় মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা মামলায় দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
৫০ হাজার ইয়াবাসহ আটক, মামলা ছাড়াই মুক্তি?
এরই মধ্যে গত ২১ সেপ্টেম্বরের একটি ঘটনা অভিযোগকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওইদিন বিকেল ৩টার দিকে ফিরিঙ্গিবাজার এলাকা থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। শান্তিরহাটের সোর্স ইসমাইলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কনস্টেবল টিপু তাদের আটক করে পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুই ব্যক্তিকে ফাঁড়িতে আনার পর ইনচার্জ এসআই কাজী মনিরুল করিম সেখানে উপস্থিত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের দীর্ঘ সময় ফাঁড়িতে আটক রাখা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো মামলা না করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
দুই মামলায় নথির সঙ্গে বাস্তব উদ্ধারের ব্যবধান
অভিযোগগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-দুটি মামলাতেই উদ্ধার ও মামলায় দেখানো মাদকের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
| তারিখ | অভিযোগ অনুযায়ী উদ্ধার | মামলায় দেখানো | পার্থক্য |
|---|---|---|---|
| ২৪ জুলাই | ১,১০,০০০ পিস | ১২,৪০০ পিস | ৯৭,৬০০ |
| ৫ আগস্ট | ৯০,০০০ পিস | ১০,০০০ পিস | ৮০,০০০ |
| মোট | ২,০০,০০০ পিস | ২২,৪০০ পিস | ১,৭৭,৬০০ |
দুই অভিযানে উদ্ধার করা মোট ইয়াবার ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ মামলায় দেখানো হয়নি। অর্থাৎ মামলার নথিতে এসেছে মাত্র ১১ দশমিক ২ শতাংশ।
এর বাইরে ২১ সেপ্টেম্বরের ৫০ হাজার পিস ইয়াবা আটকের অভিযোগও রয়েছে, যার বিষয়ে কোনো মামলা হয়েছে কি না-সেটিও স্পষ্ট নয়।
তদন্তে যেসব নথি গুরুত্বপূর্ণ
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহার, জব্দ তালিকা, গ্রেপ্তার মেমো, অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের জবানবন্দি, থানার মালখানা রেজিস্টার এবং আদালতে জমা দেওয়া আলামতের হিসাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ২৪ জুলাই ও ৫ আগস্টের অভিযানে ব্যবহৃত গাড়ি, অভিযানের সময় উপস্থিত পুলিশ সদস্য, সোর্সের তথ্য, আটক ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও হেফাজতের সময় এবং আলামত আদালতে পাঠানোর নথিও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ যদি মামলার এজাহারে উল্লেখ করা পরিমাণের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত মাদকের অবস্থান কী ছিল-এ প্রশ্নের জবাব তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ ও মামলায় দেখানো পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ উঠলে তা পুলিশের নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান ও আলামত ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। তাই অভিযোগগুলোকে শুধু স্থানীয় পর্যায়ের বিষয় হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ২৪ জুলাই ও ৫ আগস্টের দুই অভিযানের জব্দ তালিকা ও মামলার এজাহারে উল্লেখিত মাদকের পরিমাণের পার্থক্যের কারণ এবং ২১ সেপ্টেম্বরের ৫০ হাজার পিস ইয়াবা আটকের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।
বক্তব্য জানতে চাইলে হাসপাতালে থাকার কথা জানান
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাজী মনিরুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে হাসপাতালে আছেন বলে জানান। এ সময় তিনি তার মা অসুস্থ থাকার কথা জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।