THE B NEWS 24

রাত ২:০০ - বৃহস্পতিবার - ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৮ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
রাত ২:০০ - বৃহস্পতিবার - ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৮ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
চট্টগ্রাম সর্বশেষ

`রিপোর্ট দিতে কিছু খরচ আছে না?’ তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে খামারির কাছে ঘুষ দাবির অভিযোগ

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা: গরু-মুরগি পালন করে সংসারের খরচ চালান বাঁশখালীর চন্দ্রপুর গ্রামের বরপুরা এলাকার খামারি নুরুল আলম (৪৫)। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা তাঁর মালিকানাধীন ‘জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড এগ্রো ফার্ম’। গত ৭ জুলাই দিবাগত রাতে ওই খামারে চুরির ঘটনা ঘটে। আর সেই চুরির মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারী খামারি নুরুল আলমের দাবি, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুমন কবির মৃধা প্রথমে নাশতার বিল ও গাড়িভাড়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে টাকা নেন। পরে খামারে সরেজমিন তদন্তে গিয়ে মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আরও ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। এর মধ্যে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বাকি টাকা না দিলে তাঁর পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হবে না বলেও তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন নুরুল আলম।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই সুমন কবির মৃধা বলেছেন, তিনি জোর করে টাকা চাননি। তাঁর ভাষ্য, মামলার প্রতিবেদন দিতে ‘কিছু খরচ’ কেউ দেয়, কেউ দেয় না-এটি যার যার বিষয়।

চুরির ঘটনায় মামলা

খামারি নুরুল আলম জানান, গত ২৩ জুন খামার দেখাশোনার জন্য ছনুয়া ইউনিয়নের মধুখালী এলাকার মাহমুদুল করিম ওরফে মাদু (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। নিয়োগের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খামারে চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর সন্দেহের তীর যায় ওই কর্মচারীর দিকে। ঘটনার পর থেকে মাহমুদুল করিম পলাতক রয়েছেন বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় নুরুল আলম বাদী হয়ে গত ২৬ জুলাই বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলার আরজিতে বলা হয়, ৭ জুলাই দিবাগত রাতে খামার এলাকায় কেউ না থাকার সুযোগে প্রকল্প অফিসের ড্রয়ার থেকে নগদ ২৭ হাজার টাকা, প্রায় ৩ হাজার টাকা মূল্যের পাঁচটি দেশি মুরগি এবং ৯০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত কর্মচারী মাহমুদুল করিম পলাতক রয়েছেন।

পরে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুমন কবির মৃধাকে। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।

প্রথমে নাশতার বিল, পরে গাড়িভাড়া

মামলার তদন্তকে কেন্দ্র করে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ করেন বাদী নুরুল আলম।

তিনি বলেন, মামলা করার প্রায় এক সপ্তাহ পর এসআই সুমন কবির মৃধা তাঁকে ফোন করে রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে যেতে বলেন। পরে গুণাগরী এলাকায় গিয়ে ফোন করলে তাঁকে ‘পিউরিয়া’ নামের একটি দোকানে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি মামলার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে বিস্তারিত জানান।

নুরুল আলমের অভিযোগ, ওই সময় নাশতার বিল বাবদ তাঁর কাছ থেকেই ১ হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হয়। পরে ফেরার সময় গাড়িভাড়ার কথা বলে আরও ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়।

তবে এরপরও অর্থ দাবির ঘটনা থামেনি বলে অভিযোগ তাঁর।

খামারে গিয়ে আবারও টাকা দাবি

গত ২৬ আগস্ট মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড এগ্রো ফার্মে যান এসআই সুমন কবির মৃধা। সরেজমিনে তদন্ত শেষে মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তাঁর কাছে আবারও ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন নুরুল আলম।

তিনি বলেন, ‘প্রথম ধাপে তাকে আমি ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছি। আমি একজন ক্ষুদ্র খামারি। গতকাল তদন্ত করতে এসে আমার কাছ থেকে ওসি স্যারকে দেওয়ার কথা বলে আবার ৫ হাজার টাকা দাবি করতেছে। আমি তখন তাকে ৩ হাজার টাকা দিয়েছি। দাবিকৃত বাকি টাকা না দিলে আমার পক্ষে রিপোর্ট দিবে না বলে সাফ জবাব দিয়েছে।’

নুরুল আলমের অভিযোগ, একজন ক্ষুদ্র খামারির জন্য মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার প্রক্রিয়াটি এখন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার বদলে আর্থিক চাপের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

‘রিপোর্ট দিতে কিছু খরচ-টরস আছে না?’

তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে এসআই সুমন কবির মৃধার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টাকার বিষয়ে এটা কওন লাগে নাকি? মামলার রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কিছু খরচ আছে না? এটা কেউ দেয়। আবার কেউ দেয় না। এটা যার যার ব্যাপার। এটা ভুয়া কথা। আমি জোর করে চাইনি।’

তবে মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবির অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ওসিকে দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই সুমন কবির মৃধা বলেন, ‘রিপোর্ট দিতে দেরি আছে। রিপোর্ট দেওয়ার সময় আছে আরও তিন মাস। যে সময় রিপোর্ট দিমু, তখন এটার বিষয়ে কথা কমুন।’

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বাঁশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুধাংশু শেখর হালদারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটার বিষয়ে আমি তাকে বলে দিচ্ছি। আপনি বাদীর নাম বলুন।’

তবে এসআই সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, ‘এটা একটা বদমায়েশ। এ পর্যন্ত ওসি টাকা নিয়েছে এমন কিছু শুনেছেন? আমি তো কখনো এসবকে প্রশ্রয় দেই না। আপনি মামলা নম্বরটা পাঠিয়েন। দ্রুত রিপোর্ট দিয়ে দেবে। আমি তাকে বলে দেব। পারফরম্যান্স খারাপ থাকলে, তারা চাকরিও করতে পারবে না।’

ওসির নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওসির নাম তো সবাই বেচে। বুঝেন নাই? ওসির নাম না বেচলে হয়? ওসির নাম সবাই বেচে। আপনি আমাকে মামলা নম্বরটা দিয়েন। আমি বলে দেব।’

স্থানীয়দেরও রয়েছে অভিযোগ

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত এসআই সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পুলিশি সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে সেবাপ্রার্থীদের নানা কৌশলে জিম্মি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একদিকে চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদী নুরুল আলম ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছেন, অন্যদিকে মামলার তদন্ত প্রতিবেদনকে ঘিরে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আইনগত প্রক্রিয়ায় যেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সত্য উদঘাটনই প্রধান বিষয় হওয়ার কথা, সেখানে কোনো তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা কতটা গ্রহণযোগ্য?

ভুক্তভোগী খামারি ও স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *