প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগে। সরবরাহকৃত ডিজিটাল মিটারের অস্বাভাবিক বিল নিয়ে গ্রাহক ভোগান্তি এখন চরমে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি বিধি-নিষেধ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় ‘প্রমোদভ্রমণে’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম ওয়সার তিন কর্মকর্তা। কারিগরি ও সফটওয়্যার প্রশিক্ষণের নাম দিয়ে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ঠিকাদারের টাকায় এই বিদেশযাত্রা নিয়ে ওয়াসা প্রশাসনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
খোদ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণে যেতে পারবেন না। গত ২৩ মার্চ জারি করা এক পরিপত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম ওয়াসা সেই বিধিনিষেধ তোয়াক্কা না করেই কর্মকর্তাদের সফরের অনুমতি দিয়েছে। ডিজিটাল মিটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘উইংস ইনভেস্টমেন্ট এলএলসি’ এই সফরের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর চান্দগাঁও ও আগ্রাবাদ এলাকায় ৩ হাজার স্মার্ট মিটার বসানোর পাইলট প্রকল্পটি চলতি বছরের মে মাসেই শেষ হয়েছে। ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকার এই প্রকল্পের ৫ বছরের ওয়ারেন্টির ৪ বছরই পার হয়ে গেছে। কাজ শেষ হওয়ার পর এখন কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে বিদেশযাত্রাকে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। সফরকারী দলে রয়েছেন—তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান। তাদের সাথে স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন প্রতিনিধিও যোগ দিচ্ছেন।
কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে এমন কর্মকর্তাদের পাঠানো হচ্ছে যাদের কাজের সাথে এই প্রকল্পের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম এবং প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে দুজনেই দায়সারা জবাব দিয়েছেন। তারা জানান, কর্তৃপক্ষ নাম দিয়েছে বলেই তারা যাচ্ছেন, প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত কিছু জানা নেই।
বর্তমানে চট্টগ্রামে ওয়সার স্মার্ট মিটার গ্রাহকদের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, নতুন মিটারে বিল আগের চেয়ে চার গুণ পর্যন্ত বেশি আসছে। এই অব্যবস্থাপনা ঠিক করার বদলে কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রা জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঠিকাদারের টাকায় বিদেশ ভ্রমণের ফলে পণ্যের মান নিয়ে আপস করার প্রবণতা তৈরি হয়, যার মাসুল দিতে হয় সাধারণ গ্রাহকদের।
চট্টগ্রাম ওয়সার কর্মকর্তাদের উগান্ডা সফর নিয়ে এর আগেও ২০১৯ সালে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনা হয়েছিল। সেই বিতর্ক পিছু না ছাড়তেই এবার আমেরিকা বিলাস শুরু হলো। পাইলট প্রকল্পের এই ত্রুটিপূর্ণ অভিজ্ঞতার মধ্যেই বিশ্বব্যাংকের ঋণে আরও ১ লাখ স্মার্ট মিটার বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। বর্তমান প্রকল্পের কারিগরি ত্রুটি ও বিলিং জটিলতা নিরসন না করে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করা হলে গ্রাহক ভোগান্তি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ক্যাব (কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি অর্থ সাশ্রয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিদেশ সফর অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তাদের আসন্ন বিদেশ সফর নিয়ে ওঠা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগম। তিনি জানিয়েছেন, এই সফরে সরকার বা চট্টগ্রাম ওয়াসার নিজস্ব তহবিল থেকে কোনো অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, কর্মকর্তাদের এই বিদেশ সফরের প্রক্রিয়াটি অনেক আগেই সম্পন্ন করা হয়েছিল। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এই সফরের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা জিও নেওয়া হয়েছে।
সফরের খরচ সম্পর্কে স্পষ্ট করে মনোয়ারা বেগম বলেন, “এই সফরে সরকারের বা ওয়াসার কোনো খরচ হবে না। মূলত ওয়াসার ডিজিটাল মিটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই এই সফরের সমস্ত ব্যয় বহন করবে।” সাধারণত ডিজিটাল মিটারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারিগরি জ্ঞান অর্জন ও প্রশিক্ষণের জন্য এ ধরনের সফরের আয়োজন করা হয়। ওয়াসা কর্তৃপক্ষের মতে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের খরচে এই সফরের মাধ্যমে কর্মকর্তারা মিটারিং সিস্টেম সম্পর্কে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন, যা ভবিষ্যতে ওয়াসার সেবার মান বাড়াতে সহায়ক হবে।