জাটকা ইলিশ ক্রয়–বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট
প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করে নিষিদ্ধ জাটকা
অভিযুক্ত কোম্পানির তিনটি জাহাজ মাসে ৩০ টনের বেশি নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ ধরে, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে প্রায় ৫ হাজার কেজি নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ জব্দ করেছে কোস্টগার্ড। মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কর্ণফুলী থানাধীন বিএফডিসি ঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে এফভি ‘সি পাওয়ার–২’ নামের একটি মৎস্য জাহাজ থেকে এসব জাটকা জব্দ করা হয়। পরে জব্দকৃত জাটকা ইলিশ স্থানীয় বিভিন্ন এতিমখানায় বিতরণ করা হয়।
কোস্টগার্ড পূর্বজোনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই মৎস্য জাহাজে জাটকা ইলিশ ধরার জন্য ব্যবহৃত জাল পাওয়া গেছে। জাহাজের লোকজন জেনে–বুঝেই নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ শিকার করেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জাহাজ থেকে ইঞ্জিনচালিত সাম্পানে করে জাটকা নামানোর সময় কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে সেগুলো জব্দ করে।

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর চট্টগ্রামের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. জহিরুল হক বলেন, গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বিএফডিসি ঘাট সংলগ্ন এলাকায় রুটিন টহলকালে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আনুমানিক ৫ হাজার কেজি জাটকা জব্দ করা হয়। পরে এসব জাটকা স্থানীয় এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, পরিদর্শক এয়াছিন মজুমদারের নেতৃত্বে জাহাজটির কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তিনটি মৎস্য জাহাজ রয়েছে। প্রতিটি জাহাজ মাসে দু’বার করে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। একটি জাহাজ একবার ফিশিংয়ে গেলে অন্তত পাঁচ টন জাটকা ইলিশ আহরণ করে। ফলে তিনটি জাহাজ মাসে ৩০ টনের বেশি নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ ধরে, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
এদিকে জাটকা ইলিশ ক্রয়–বিক্রির সঙ্গে জড়িত ২০ থেকে ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা স্বল্প দামে জাটকা কিনে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে এই নিষিদ্ধ মাছগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করে বাজারজাত করা হয়। জহির, শফি, আল আমিন, শামসুল আলম, তাহের ও সালাউদ্দিনসহ স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা।
মৎস্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কর্ণফুলী নদী হয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া বাণিজ্যিক মৎস্য জাহাজগুলো বছরে প্রায় ১০ হাজার টন নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ আহরণ করে। এসব জাটকা স্থানীয় প্রভাবশালীরা স্বল্প দামে কিনে নিয়ে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেশের জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষায় জাটকা নিধনকারী এসব জাহাজ ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাটকা রক্ষা কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ পেলে পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হয়, যা দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও সহায়তা করে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে ৯ ইঞ্চি বা ২৩ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের ইলিশ, যা ‘জাটকা’ হিসেবে পরিচিত, তা ধরা, পরিবহন ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ‘মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০’ অনুযায়ী প্রথমবার অপরাধ করলে ১ মাস থেকে ৬ মাস পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার পাশাপাশি অপরাধে ব্যবহৃত জাল, নৌকা বা মৎস্য জাহাজ ও জব্দকৃত মাছ বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।