এই পৃথিবীর প্রতিটি দিকেই রয়েছে আল্লাহর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অসংখ্য নিদর্শন। বিশাল এই সৃষ্টিজগৎ এক অটল বিধান ও নিয়মের অধীনে চলছে, যা স্পষ্ট প্রমাণ দেয় যে এর স্রষ্টা ও পরিচালক এক সর্বশক্তিমান শাসক। তাঁর ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে কেউ স্বাধীনভাবে থাকতে পারে না। সমগ্র সৃষ্টির মতো মানুষের প্রকৃতিও তাঁর আনুগত্যশীল। তাই মানুষ অজান্তেই দিন-রাত তাঁর নিয়ম মেনে চলছে, কারণ তাঁর প্রাকৃতিক বিধান অমান্য করে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না।
তবে আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা, চিন্তা-ভাবনার শক্তি এবং সৎ-অসৎ পার্থক্য করার যোগ্যতা দিয়ে সীমিত স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই স্বাধীনতাই মানুষের জন্য পরীক্ষা—জ্ঞানের, যুক্তির এবং দায়িত্ববোধের পরীক্ষা। মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট পথে বাধ্য করা হয়নি; কারণ বাধ্য করলে পরীক্ষার উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যেত। যেমন পরীক্ষায় প্রশ্ন দিয়ে যদি পরীক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট উত্তর দিতেই বলা হয়, তবে তার আসল যোগ্যতা প্রমাণ হয় না। ঠিক তেমনভাবেই মানুষকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে যাতে সে নিজেই ঠিক বা ভুল পথ বেছে নেয়। যে সঠিক পথ গ্রহণ করবে, সে সফল হবে; আর যে ভুল পথ নেবে, সে ব্যর্থ হবে।
এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা নিজের ও সৃষ্টির প্রকৃত স্বভাব বোঝেনি, আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণাবলি চিনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং স্বাধীন ইচ্ছাকে ব্যবহার করেছে অবাধ্যতার পথে। এরা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে এবং নিজেরাই নিজেদের জন্য ধ্বংস ডেকে এনেছে। অন্যদিকে, যারা জ্ঞান-যুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহকে চিনেছে, সৎ-অসৎ পার্থক্য বুঝে সঠিক পথ বেছে নিয়েছে, তারা পরীক্ষায় সফল হয়েছে। তাদের স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু তারা স্বেচ্ছায় আল্লাহর আনুগত্য বেছে নিয়েছে। তাই তারাই সম্মান ও সাফল্যের অধিকারী।
এ শ্রেণির মানুষ বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি বা আইনের মতো জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পথ অবলম্বন করে। একজন প্রকৃত মুসলিম বিজ্ঞানী যতই আবিষ্কার ও কৃতিত্ব অর্জন করবে, ততই তার আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস বাড়বে। সে জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অপব্যবহার করবে না, বরং মানবকল্যাণে কাজে লাগাবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে, অর্থনীতিতে ন্যায়সঙ্গত পথ অনুসন্ধান করবে, রাজনীতিতে ন্যায় ও কল্যাণের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। আইন ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষাই হবে তার লক্ষ্য।
মুসলিম চরিত্রের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহভীতি, সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতা। একজন প্রকৃত মুসলিম বুঝে যে তার সবকিছু আল্লাহর দান ও আমানত। নিজের শরীর ও শক্তিরও মালিক সে নয়। আল্লাহ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই এই আমানত ব্যবহার করা তার কর্তব্য। একদিন এসবের হিসাব দিতে হবে—এই বিশ্বাসই তাকে জীবনে সৎপথে রাখে। তাই সে মিথ্যা বলে না, জুলুম করে না, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না। সত্য ও ন্যায়ের জন্য সে সবকিছু কুরবান করতেও প্রস্তুত থাকে।
যার মাথা আল্লাহ ছাড়া আর কারও সামনে নত হয় না, যার হাত কেবল আল্লাহর কাছেই প্রসারিত হয়, তার মতো সম্মানিত আর কে হতে পারে? যে আল্লাহ ছাড়া আর কারও ভয়ে চলে না, তার মতো শক্তিমান আর কে? যে অবৈধ সম্পদের প্রতি লোভী নয়, বৈধ পরিশ্রমের উপার্জনেই তৃপ্ত থাকে, তার মতো ধনী আর কে হতে পারে?
যে মানুষের অধিকার স্বীকার করে, সদাচরণ করে, সবার কল্যাণ কামনা করে অথচ প্রতিদানে কিছু আশা করে না, তার মতো প্রিয় ও বিশ্বস্ত বন্ধু আর কেউ হতে পারে না। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, আমানত অক্ষুণ্ণ রাখে এবং আল্লাহকে সাক্ষী জেনে সবকিছু করে। তাই মুসলিম চরিত্র যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেখানে মুসলিম কখনো অপমানিত, পরাজিত বা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে পারে না। বরং সে থাকবে বিজয়ী, নেতৃত্ব দেবে সম্মানের সাথে।
এইভাবে দুনিয়ায় সম্মান ও ইজ্জতের জীবনযাপন শেষে যখন সে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে, তখন আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ তার উপর বর্ষিত হবে। যে আমানত তাকে দেওয়া হয়েছিল, সে তার হক আদায় করেছে; পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে সফল হয়েছে। এ সাফল্য শুধু দুনিয়ায় নয়, আখেরাতেও চিরস্থায়ী।
ইসলাম হলো মানুষের স্বভাবধর্ম। কোনো বিশেষ জাতি বা দেশের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। সব যুগে, সব দেশে, যে সত্যনিষ্ঠ ও আল্লাহপরায়ণ মানুষ ছিল, তারাই প্রকৃত মুসলিম, যদিও তারা নিজেদের ধর্মের নাম অন্য কিছু বলেছিল।
সূত্র: ইসলাম পরিচিতি